শেখর দুবে: বাংলার প্রচলিত জনপ্রিয় লোকগান ‘‌দাদা পায়ে পড়ি রে, মেলা থেকে বউ এনে দে।’‌ শুনে মনে হতেই পারে, জীবনসঙ্গিনী কি কোনও পণ্য যা কিনতে পাওয়া যাবে মেলার দোকানে। কিন্তু কেনবেচা না হলেও মেলা থেকেই স্ত্রী সংগ্রহ করে নেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে এই বাংলাতেই। এবং বিজয়া দশমীর ঠিক পরের দিনই সেই মেলা হয় নবগঠিত ঝাড়গ্রাম জেলার মফঃস্বল শিলদার ঠিক পাশের ছোট্ট গ্রাম ওড়গোঁদায়।
রীতি মেনেই এবছরও শুরু হয়েছে সেই মেলা। ঢুকলেই দেখা যাবে রাস্তার দু’‌পাশে সাজানো হাঁড়িয়ার হাঁড়ি। দেদার বিক্রি হচ্ছে ডালভাজা, চপ, ঘুগনি, পাঁপড়। ভিড়ের চোটে পা রাখাই দায় ওড়গোঁদার ভৈরবথানের মেলাপ্রাঙ্গনে। দশমীর পরদিনই পাটাবিঁধার মেলা বসে ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদা সংলগ্ন ভৈরবথানে। মূলত আদিবাসী সমাজের মানুষ অংশ নেন এই মেলাতে। তবে সাদামাটা আর পাঁচটা মেলার সঙ্গে অনেকটাই পার্থক্য রয়েছে এই পাটাবিঁধা মেলার। একা একা এই মেলাতে এলেও এখন থেকেই জীবনসঙ্গী কিংবা সঙ্গিনী খু্ঁজে নিয়ে বাড়ি ফেরেন সাঁওতাল পুরুষ ও নারীরা। বহু বছর ধরে চলে আসছে এরকমই নিয়ম। বলা ভাল, ওড়গোঁদা ভৈরবথানের পাটাবিঁধার মেলা যেন আদিবাসীদের স্বয়ংবরসভা।

ওড়গোঁদা এবং তার আশেপাশে বসবাস করা মাহাত, আদিবাসী জনজাতি লোকের সংখ্যাটা অনেকটাই বেশি। মালতি-সাগেনরা যেমন উৎসাহ নিয়ে দুর্গাপুজোয় সামিল হন, তেমনই পুজোর শেষে পাটাবিঁধা মেলাতে উপচে পড়ে ভিড়। ওঁড়গোদার যে মাঠে পাটাবিঁধা মেলা বসে সেখানেই বিরাজমান ‘‌বাবা ভৈরব’‌। এলাকার মানুষজন বিভিন্ন মানত নিয়ে মাঝে মাঝেই উপস্থিত হন ভৈরবথানে।

তবে পাটাবিঁধা মেলায় এই ভৈরবথানের চেহারা থাকে একেবারে অন্যরকম। বিজয়ার পরদিন দুপুর থেকেই প্রচুর মানুষ আসেন এই মেলাতে। বসে প্রচুর দোকানপাট। আলো দিয়ে সাজানো হয় পুরো মাঠ। মেলা চলে পরের দু’‌দিন। এই দু’‌দিনে দেদার বিক্রি হয় হাঁড়িয়া, মহুয়া, দেশি মদ, তেলেভাজা, বারোভাজা। আর এই মহুয়া খেয়েই সাঁওতাল তরুণরা প্রেম নিবেদন করেন মেলায় আসা তরুণীদের। তরুণের প্রেমে সাড়া দিলেই কেল্লাফতে, আর কোনও বাধা থাকে না। সারারাত মহুয়া খেয়ে নাচ, কেনাকাটা। সকালে সোজা তরুণের বাড়িতে গিয়ে ওঠা। অবশ্য তারপর নিজেদের নিয়ম মেনে আনুষ্ঠানিক বিয়েও হয়।

বেলপাহাড়ি থেকে মেলায় আসা বছর ৩০ এর যুবক উত্তম মাণ্ডি বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেলায় আসছি। দাদা এই মেলা থেকে বৌদি নিয়ে গেছে। মেলার খাওয়া, ঘোরা, কেনাকাটা তো রয়েইছে, সঙ্গে বড় আকর্ষণ মেলার প্রেম।’ তিনিও কি এই মেলা থেকে জীবনসঙ্গিনী খুঁজে নিয়ে ফিরবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে উত্তম জানান, ‘দেখুন আগে এই মেলা থেকে অনেকেই বিয়ে করে বাড়ি ফিরত, কিন্তু এখন ততটা হয় না। মেয়েরা এখন পড়াশুনো করছে, দেখেশুনে তবেই ঠিক করছে জীবনসঙ্গী। তবে প্রেমে আপত্তি থাকে না।’