দেবাশীষ দাস: একটা সময় ছিল, যখন আর্যরা হাতির ব্যবহার জানতেন না। হাতিকে বড় হরিণ হিসেবেই ধরতেন তাঁরা। কিংবা একসময় প্রতিমা তৈরি হতো গাছ দিয়ে। অথবা চৈতন্যদেবের জন্মের আগে পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মের যে ব্যাপক প্রসার ছিল বাংলায়, তা কীভাবে মাত্র কয়েকশো বছরের মধ্যেই প্রায় লুপ্ত হয়ে গেল, ইতিহাস ঘাঁটলে এমন নানা প্রশ্নের উত্তর মেলে সহজেই। চর্যাপদ পুঁথির আবিষ্কারক তথা গবেষক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখায় এমন অনেক তথ্য পাওয়া যায় প্রাচীন সভ্যতার। এমনই নানা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে নৈহাটির দ্য শাস্ত্রীপাড়া স্পোর্টিং ক্লাবের দুর্গাপূজা কমিটি। দুর্গাপূজার থিমে ইতিহাস ও বিবর্তন সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দুঃসাহস দেখানোর বিষয়ে হয়তো আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে। কিন্তু আজ থেকে ১০০ বছর আগে যে পুজো শুরু হয়েছিল পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর হাত ধরে, সেখানে দুঃসাহসিকতার নমুনা তো থাকবেই। শাস্ত্রীপাড়ার এই ঐতিহ্যশালী পূজাকমিটির এবারের থিম ‘শাস্ত্রীর আলোকে শাস্ত্র’।আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে থেকে নৈহাটির মহাকালীতলায় দুর্গা পুজোর আয়োজন করতেন স্থানীয়রা। তখন হাতে গোনা কয়েকটা পুজো। কিন্তু ১৯২০-১৯৩০ সাল নাগাদ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই পুজো। কথিত আছে, স্থানীয় মহিলারা তখন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর শরণাপন্ন হয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা কোথায় পুজো দেব?’ তখন থেকে নিজে কাঁধে দায়িত্ব নিয়েই পুনরায় পুজো চালু করেছিলেন তিনি। শুধু স্থান পরিবর্তিত হয়ে মহাকালীতলা থেকে তা আসে শাস্ত্রীপাড়ায়। হরপ্রসাদবাবু নিজে চণ্ডীপাঠ করতেন সেখানে। সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে হতো এই পুজো। তারপর একাধিকবার বদলেছে জায়গা। নৈহাটির নরেন্দ্র বিদ্যানিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা তথা রিপন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. নরেন রায়ের বাড়িতেও অনুষ্ঠিত হয়েছে এই পুজো। ঐতিহ্যশালী এই পুজোকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন স্থানীয়রা।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পুত্র বিনয়তোষ ভট্টাচার্য ছিলেন আর একজন পণ্ডিত। তাঁরই সুযোগ্য সন্তান ড. অমিয়কুমার ভট্টাচার্য ক্লাবের জন্য জায়গা দিয়েছিলেন। সেখানেই ১৯৮০ সাল নাগাদ গড়ে ওঠে দ্য শাস্ত্রীপাড়া স্পোর্টিং ক্লাব। পুজোকমিটি এই শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখতে চান হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে। তাঁর লেখা, তাঁর গবেষণার ফসলকে কেন্দ্র করেই এবারের থিম ‘শাস্ত্রীর আলোকে শাস্ত্র’। কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য অয়নকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এতদিন পর্যন্ত আমাদের পুজোর বাজেট ছিল দেড় লক্ষ টাকা। কিন্তু এবারে আমরা অন্যরকম কিছু করার কথা ভেবেছি। স্বাভাবিকভাবেই বাজেট অনেকটাই বেশি হচ্ছে। বারোয়ারি পুজো হলেও পণ্ডিত বংশ যুক্ত থাকায় আচার-সংস্কৃতি মেনেই পুজো করি আমরা।’

‘শাস্ত্রীর আলোকে শাস্ত্র’ থিমে কী দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা? এর উত্তরে পূজা কমিটির পক্ষে অয়নবাবু বলেন, ‘বাঙালির এই সভ্যতা অনেক পুরনো। ইতিহাস বলে, আর্যরা হাতিকে বড় হরিণ হিসেবেই জানত। আমরা সেই সময়কে ধরার চেষ্টা করেছি। এছাড়া নালন্দার অধ্যক্ষ শীলভদ্রের ছোঁয়াও রয়েছে এখানে। এই প্রসঙ্গেই শাস্ত্রী মহাশয়ের ‘নবপত্রিকা’ প্রবন্ধের কথা বলতে হয়। তিনি সেখানে লিখেছিলেন, মৃৎশিল্প যখন উৎকর্ষ হয়নি তখন গাছ দিয়েই তৈরি হতো মূর্তি। ন’টি গাছ দিয়ে দুর্গার মূর্তি গড়ার রেওয়াজ ছিল। আমরা সেই ভাবনা দেখাতে চেয়েছি। কিংবা অনার্য দেবতা শিব কীভাবে নিজগুণে আর্যদের দ্বারা পূজিত হলেন, সেই ইতিহাসের কথা ছাড়াও আমাদের ভাবনায় রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের ক্রমবর্ধমান বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কাহিনিও। কীভাবে চৈতন্যদেবের আগমনের পর হিন্দুরা ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্মকে গ্রাস করেছিল, তা দেখানোর চেষ্টা করছি আমরা।’

কথায় বলে, লক্ষ্মী আর সরস্বতী একসঙ্গে থাকেন না। শাস্ত্রী মহাশয়ের লেখা প্রায় ৬০-৭০টি প্রবন্ধের মধ্যে বেশ কিছু গবেষণাধর্মী ভাবনা রূপায়ণের মতো চেষ্টা চালাচ্ছেন দ্য শাস্ত্রীপাড়া স্পোর্টিং ক্লাব পুজো কমিটি। অথচ ক্লাবের চালা দিয়ে জল পড়ে এখনও। ক্লাবের এই বেহাল দশা সত্ত্বেও হরপ্রসাদবাবুকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছেন সদস্যরা। পুজো কমিটির সাম্মানিক প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন প্রাক্তন এসএসসির চেয়ারম্যান ড.‌ রণজিৎ বসু, কার্যনির্বাহী সভাপতি আশিস বসু, সম্পাদক কৌশিক চক্রবর্তী। আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়েও ঐতিহ্যের স্বাদ পেতে, ইতিহাস জানতে আপনাকে ঢুঁ মেরে আসতেই হবে নৈহাটি স্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে শাস্ত্রীপাড়ার দুর্গা পুজোয়।