সায়ন: মনে হয় কিছু লিখি। কিন্তু লেখা খুব সহজ কাজ নয়। লকডাউনে একটা বিষয় লক্ষ করলাম, বাঙালি জাতি অনেক কিছু লিখতে পারে। লেখার চাহিদা আছে খুব। তাই ৫ মাসের মধ্যে শ’খানেক ওয়েব ম্যাগাজিন প্রকাশ হয়ে গেল!

তাহলে লেখার জন্য অবসরের প্রয়োজন আছে এটা মানতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, লেখার জন্য অবসর চাই, না ভাবার জন্য অবসর চাই?

ঠিক এই ভাবনা থেকেই একজন মানুষের কাছে আমার বিস্ময় বারবার ফিরে যায়– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ৩৫৬ দিন যার হাতে কলম একটি চাবুক ও মুক্তাঞ্চল। তিনি কত অনায়সে বলতে পারেন:
“সম্রাট শাজাহানের চেয়ে বিল গেটস অনেক বেশি ধনী
কিন্তু তিনি তাজমহল বানাবেন না
ভালোবাসা এখন আর মর্মরে নেই, পাহাড়চূডায়”

আসলে লেখা একটা দর্শন। আর দর্শন বিশ্বাস ছাড়া কিছুই নয়। সুনীলের গোটা জীবন এক অনন্ত বিশ্বাসের পটচিত্র। যেখানে তিনি নিজেই তার স্রষ্টা ও হন্তারক। তাঁর ‘প্রতিটি ট্রেনের সঙ্গে আমার চতুর্থ ভাগ আত্মা ছুটে যায়’।

অনেক কিছু পড়লাম এই ভার্চুয়াল জগতে এসে। শিখলাম একটাই, যা অতি ভয়ানক ও বটে, ন্যূনতম ভাবনা দিয়ে কিভাবে অগভীরকে একটা গভীর বিষয়ে পাল্টে দেওয়া যায়। হকিইমার কিংবা বদরিলার্দ এর দর্শন নিয়ে টানাটানি করে কিছু বলতে চাই না, কিন্তু ভয় লাগে মনে মনে যখন দেখি মানুষ প্রতিটি বিষয়ে নিজেদের মাথাটা ঘামায়। এতো ঘাম হাওয়া তো ভালো নয় তাই না! এটাই ভাবি। আর সবাইকে যে সব বিষয়ে পারদর্শী হতেই হবে এটা তো মানবতার শর্ত কিংবা সংবিধানের প্রস্তাবনা, এমনটা নয়। তাহলে লেখে কেন সবাই? ইগো? নিজের অস্তিত্বের প্রতি হীনমন্যতা নাকি:
“এইরূপ কর্মব্যস্ত জীবনের ভিতরে বাইরে ডুবে থেকে
বিকেলের অমসৃণ বাতাসে হঠাৎ আমি দেখি
আমার আত্মার একটা কুচো টুকরো আজও কোনও
কাজ পায়নি।”

একটা অমলিন আত্মা অনেক শতাব্দী ধরে ঘুরপাক খেতে অবশেষে আশ্রয় খুঁজে পায় কোনও এক হৃদয়ের ভাষায়। সুনীল এক ফেরারী খাতার কাছে বলে ‘জাদুঘরে অজস্র ঘড়িতে আমি অজস্র সময় লিখে রাখি’। আমাদের বালিঘড়ি জুড়ে লেখা কলকাতার নিঃশ্বাস আজও যখন ক্লান্ত হয়ে অপেক্ষা করে আউট্রাম ঘাটে, চায়ের উষ্ণতার তখন ঠোঁট গাল স্পর্শ করে বলে
“এবার চলো বেলুনে যাই, বাজি পোডা়ই, আগুন খাই
ঐ তো কাছেই সব হারাদের স্বর্গ
…….
পোশাক টোশাক আর যা দেখি নকল মেকি সব গেছে কি
যোনি ত্রিভুজ ঢাকা অপরাজিতায়?”

এই শব্দবিশ্বাস, ভাষাবিশ্বাসের কাছেই তো আশ্রয়। অনেক তো লেখা হয়, কিন্তু সুনীলের আত্মা কেন ঘুরে ফেরে জীবনের খাতার পাতায়?
ইগো নয় অহং নয় লোক দেখানো নয়, জেগে থাকা জীবনের উৎসবের কাছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক পৃথিবী ঘর, যেখানে ‘আর আমাদের দূরত্ব নেই, শূন্যতা নেই, পূর্ণতা নেই/ লুঠ করবো এবার স্বর্ণ মডা়ই’

জীবনলেখায় যার নাম লেখা আছে, জীবনরেখায় তার থাকা না থাকার মধ্যে কোনও তফাত হয় না। তবুও শব্দহীনতা বড় ভয়ানক। একটা গোটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল। কেউ কোথাও নেই। রাস্তা ঘাট শুনশান। ‘স্মৃতির শহর’-এ কি তাহলে সব শব্দ নিভে যাবে। তা তো হয় না , উৎকন্ঠার চরম বিন্দুতেও তোমাকে ছুঁয়ে আমি বলতে পারি “সুখ, সুখ নয়, পাপ, পাপ নয়, দোলে, দোলে না,/ ভাঙে, ভাঙে না, মৃত্যু, স্রোতে/ আমি, ও আমার মতো, আমার মতো, ও আমি/ আমি নয়, একজীবন দৌড়তে দৌড়তে…” আমরা বারবার একটা ভালোবাসার সামনে এসে দাঁড়াবো যেখানে শুধু জন্ম আছে কোনও মৃত্যু নেই।