দীপজিৎ দে:‌ প্রত্যেকটি সাফল্যের অন্তরালে থাকে প্রতিবন্ধকতার কাহিনি। বাধাবিপত্তির চড়াই–উৎরাই পেরিয়ে তবেই সামনে আসে সাফল্যের সিঁড়ি। দেখে নেওয়া যাক এমনই ন’‌জন সফল বিজ্ঞানীর জীবনসংগ্রামের কাহিনী, যা আমাদের কাছে এক একটি শিক্ষণীয় অধ্যায়।

১. স্যার আইজ্যাক নিউটন:‌—নিজের জীবনে বহু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর জগৎ গড়ে উঠেছিল একাকিত্বের পরিসীমায়। পিতৃহীন নিউটনকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যান তাঁর মা। কিশোরজীবনের এই একাকিত্বই তাঁকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করে তুলেছিল। মানসিক অবসাদ গ্রাস করেছিল অল্প বয়স থেকেই। একা থাকতে পছন্দ করতেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবন ছাড়াও তাঁর সাধনার জগতেও নেমেছিল বিপর্যয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুড়ে যায় বহুদিনের গবেষণাপত্র। যার ফলে ‘আলো’ সংক্রান্ত নিউটনের বিস্তর গবেষণা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তা সত্ত্বেও বিখ্যাত গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ ও পদার্থবিদ স্যার আইজ্যাক নিউটন ইতিহাসের সর্বকালীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক।

২. মেরি কুরি:‌—বিখ্যাত রসায়নবিদ ম্যাডাম কুরি ছিলেন পোল্যান্ডের নাগরিক। তবে তাঁকে তাঁর উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে চলে আসতে হয়। কারণ পোল্যান্ডের তৎকালীন নাৎসি সরকার ছিল নারীদের উচ্চশিক্ষার বিপক্ষে। নারী হওয়ার কারণে পরবর্তীকালে ফ্রান্সেও তাঁকে তাঁর গবেষণায় বহু বাধার সামনে পড়তে হয়েছে। তবুও পরিশ্রম ও নিষ্ঠার জন্যই তিনি তেজস্ক্রিয় পদার্থ পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কার করেন। ১৯১১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ম্যাডাম কুরি।

৩. লুই পাস্তুর:‌—ফরাসী জীববিদ ও রসায়নবিদ এবং টীকাকরণে জনক লুই পাস্তুর বাল্যকালে ছিলেন খুবই মাঝারি মানের ছাত্র। তাঁর পরীক্ষার ফলাফল কখনই ভাল হতো না। ফলে তাঁকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বারবার বিভিন্ন জটিলতার সামনে পড়তে হয়েছে। কলেজ জীবনের প্রথম পরীক্ষায় তিনি অনুত্তীর্ণও হয়েছেন। সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সত্বেও তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করেন এবং পরবর্তীকালে টীকাকরণ এবং ‘‌ফার্মেনটেশন’‌ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

৪. নিকোলা টেসলা:‌—বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা কর্মজীবনে বহুসময়ে প্রতিকূলতার সামনে পড়েছেন। ১৮৯৫ সালে তাঁর ল্যাবরেটরিতে আগুন লাগে এবং তাঁর গবেষণাপত্র পুড়ে যায়। পরবর্তীকালে অর্থাভাবেও বহুবার তাঁর গবেষণার কাজ পিছিয়ে গিয়েছে। তবুও সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে তাঁর ‘‌অল্টারনেটিং কারেন্ট’‌ নিয়ে করা কাজ আজও সমাদৃত।

৫. ব্লেইজ পাস্কাল:‌—ফরাসি পদার্থবিদ ও দার্শনিক ব্লেইজ পাস্কাল ছিলেন একাধারে প্রতিভাবান এবং দুর্ভাগ্যবান। শৈশবেই তিনি তাঁর মা–কে হারান। কৈশোর থেকেই শারীরিক অসুস্থতা তাঁর জীবনে থাবা বসানোর চেষ্টা করেছে। তবুও তিনি অল্প বয়স থেকেই নিজের অদম্য মানসিকতায় আবিষ্কার করেছিলেন প্রথম মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর। তাঁর আবিষ্কৃত সম্ভাবনা তত্ত্ব তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান হিসাবে গণ্য করা হয়।

৬. জোহান কেপলার:‌—বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ জোহান কেপলার বাল্যবয়সে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন এবং সেই সময় থেকেই তাঁর দৃষ্টিশক্তি এবং স্বাস্থ্য— দুটোই দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর চোখ দূরবীন থেকে দূরে রাখা যায়নি। জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর অনুসন্ধিৎসা এবং গণিতের প্রতি তাঁর দখল তাঁকে এক অন্যতম বৈজ্ঞানিক হিসাবে ইতিহাসের পাতায় প্রতিষ্ঠা করেছে।

৭. এডউইন হাব্‌ল:‌— বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডউইন কেপলার পেশায় ছিলেন একজন উকিল। তবে তিনি স্বেচ্ছায় আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে চাননি কোনওদিনই। তাঁর বাবার আদেশে বাধ্য হয়েই তাঁকে আইন নিয়ে পড়াশোনা চালাতে হয়। তাঁর বাবার মৃত্যুর পর তিনি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। নয়তো, মহাজাগতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে করা তাঁর অসামান্য অবদানের থেকে আমরা চিরকাল বঞ্চিত হতাম।

৮. অ্যালবার্ট আইনস্টাইন:‌—জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ অ্যালবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন আপেক্ষিকতাবাদের জনক এবং সম্ভবত আধুনিক সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক। তবুও অবিশ্বাস্য ভাবে তাঁর গণিতের প্রতি বৈরাগ্য ছিল। অন্তরকলনবিদ্যা বা ক্যালকুলাসের জটিল হিসেব নিকেশে ছিল তাঁর বরাবরের অরুচি। যদিও তাঁর এই মনোভাব কোনওদিন তাঁর গবেষণার কাজে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি।

৯. স্টিফেন হকিং:‌—শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার এক অসামান্য উদাহরণ হলেন স্টিফেন হকিং। এক অতি বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্যারালিসিসে শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারান। ধীরে ধীরে বাকশক্তিও চলে যায় তাঁর। কিন্তু তাও তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ও যন্ত্রের সাহায্যে তিনি তাঁর চিন্তাভাবনার ব্যাপারে আমাদের জানিয়ে গিয়েছেন। ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে তাঁর গবেষণা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যায় নতুন এক পথের পথিকৃৎ।