পারিজাত ব্যানার্জী

ঠিকঠাক করে নিজের পাড়াটুকু কি চিনে ওঠা যায় কখনো? পাঁচ বছরের ভিতু ‘আমি’টা দরজার আড়াল থেকে যেই পৃথিবীটা দেখেছে এক সময়, পরে হাট করে খুলে যাওয়া অবারিত দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে জেনেছি– সেও কেবলই ভ্রম। ছোটবেলার কলকাতার যে স্মৃতি বুকে আঁকড়ে বসে আছি আজও, তারও ঠিকানা কিন্তু খুব বেশি দূরে ছিল না কোনও দিন– মোড়ের মাথায় কলপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটা বরাবরই তার আয়তন। মনে আছে, বাবার হাত ধরে স্কুল যাওয়ার পথে স্পষ্ট দেখতে পেতাম, গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালটা গিয়ে কেমন করে মিশে যাচ্ছে নীল আকাশের উজাড় করে দেওয়া এক বুক আবেশে। তখন থেকেই আশা জমে থাকবে ভিতর ভিতর– ঠিক এমন করেই আমিও কখনও পাড়ি জমাব কোনও সুদূর প্রদেশে।

গত এক বছর হল অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে এসে ঘাঁটি গেড়েছি আমি আর আমার স্বামী তারই চাকরিসূত্রে। এই এক বছর যাবৎ যার সাথেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বা দূরভাষে আলাপ জমিয়েছি, সকলেরই কিছু বাঁধাগত প্রশ্নের শিকার হয়েছি। প্রশ্নগুলি যদি আমি জড়ো করি এক জায়গায়, তাহলে দেখা যাবে তার ধরাবাঁধা পথটা খানিক এরকম–

১)“ওবাবা, সিডনি? তা ওখানকার ক্রিকেট গ্রাউণ্ডটা তো শুনেছি চরম,ওখানের সবাই আবার আমাদেরই থেকেও বেশি ক্রিকেটপ্রাণা, তাই না?”
২)“ক্যাঙ্গারু দেখেছো? বাড়ির আশপাশে আমাদের নেড়ি কুকুরের মতো শুনেছি তারা ঘুরে বেড়ায় ওদেশে?”
৩)“অস্ট্রেলিয়া মানেই তো সমুদ্র সৈকত– তা তোমাদের বাড়ি থেকে কতদূরে বিচ? শুনেছি সেখানে স্বল্পবাসে অনেক সুন্দরী রমণী দেখতে পাওয়া যায় সহজেই?”
৪)“বিদেশ মানেই তো ঘোরাফেরা, আনন্দ! আমাদের মতো কষ্ট আর সেখানে কোথায়– তাই না?”

আবার এরকমও শুনেছি–
৫)“অস্ট্রেলিয়ার তো এই হালের মাত্র দুশো বছরের ইতিহাস — ওখানকার সবাই তো ইংল্যাণ্ড থেকে আসা টকটকে সাহেব।আচ্ছা, তার আগে তাহলে কোথায় ছিল বলোতো এই মহাদেশ?”

এরকম আরও কত কি যে মনে গড়া ‘শোনাকথা’দের ছড়াছড়ি যে থাকে আমাদের ছাপোষা বাঙালিদের জীবনভর, তা সত্যিই বোঝা দায়। আসলে বুঝি, আমাদের মতো এই সাধারণ মধ্যবিত্তদের সাধ্যে তো কুলোয় না সবসময় বিদেশভ্রমণ — তাই এই ধারণাগুলোকেই কেন্দ্র করে ফুটিয়ে তুলি নিজের নিজের চিত্রপট— এক আস্ত পৃথিবীর আদলে। ঠিক যেমন আমি করেছিলাম ছোটবেলা— গাছের ডালের সাথে স্বপ্ন উড়ান বেঁধে।

নাঃ, সীমিত পরিসরে আমাদের ভারতবর্ষের থেকে প্রায় আড়াইগুণ বড় এই দেশকে তুলে ধরতে হলে সময় থাকতেই এইসব প্রশ্নগুলির পরপর উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। নাহলে এই ‘বিদেশ’ ব্যাপারটি বরাবরই অলীক রয়ে যাবে।

১) প্রথমত, সিডনি ক্রিকেট গ্রাউণ্ডে অবশ্যই গেছি। তবে আমাদের মতো এদেশের মানুষের আলাদা করে ক্রিকেটে বিষয়ে উৎসাহ তো এখনো অবধি অতটা চোখে পড়েনি। ওই খেলা হলে হইহই করে বটে সবাই — তবে তার চেয়ে বেশি বাড়াবাড়ির দেখা মেলা ভার। বরং ঘোড়দৌড় বা রাগবিখেলায় এদের প্রবল উৎসাহ। প্রতি শনি-রবি করেই সম্ভ্রান্তরা সাহেবি কেতায় সেজে ভিড় জমান রেসের মাঠে। আর বিকেল পরলেই রাস্তাঘাটে দেখা যায়, নিজের নিজের দলের জার্সি পরে হইহই করে রাগবি খেলার মাঠের দিকে পা বাড়িয়েছে বাচ্চা থেকে বুড়ো। তবে হ্যাঁ, শরীরচর্চায় প্রতিটি অস্ট্রেলিয়র কিন্তু তুমুল মনোনিবেশ। তাই যেকোনো ধরণের খেলাধূলায় এরা আমাদের সামগ্রিক মানুষজনের থেকে বোধকরি খানিকটা হলেও শারীরিক ভাবে অন্তত বেশিই তৎপর এবং উতসাহী।

২) দ্বিতীয়ত, না, ক্যাঙ্গারুর সংখ্যা এই দেশে মানুষের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ হলেও কোনো শহরেরই রাস্তাঘাটে তারা বিশেষ চড়ে বেড়ায় না। ক্যাঙ্গারু হরিণের মতোই ভীরু বন্য এক জন্তু। প্রধানত তাদের দেখা মেলে ন্যাশনাল পার্ক বা বিপুল সুদূরপ্রসারী সব জঙ্গল বা দ্বীপে। তবে একবার মানুষের ছোঁয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলে তারা কিন্তু বেশ বন্ধুবৎসল। শুধু ক্যাঙ্গারুই নয়, এমন কিছু জন্তুরও দেখা মেলে এদেশে যাদের অন্য কোথাও চট করে আর চোখে পড়বে না। বিশালকায় জলজ প্রাণী ডুগং (যাকে পূর্বে নাবিকরা জলপরী ঠাহর করত) বা চ্যাপ্টা ঠোঁট সর্বস্ব প্ল্যাটিপাস ছাড়াও ইউক্যালিপটাস ভক্ষণকারী ছোট্ট গেছোভালুক কোয়ালা, বৃহদাকার ক্যাসোওয়ারি বা এমু পাখি, মানুষের মতো অট্টহাস্যে মশগুল কোকাবুরা পাখি,আমাদের কাকের সাদাতুতো ভাই – ম্যাগপাই, নানান রঙ আর বর্ণের কাকাতুয়া, টিয়া, প্রবল বিষধর সাপ তাইপান,নীল জিভধারী গিরগিটি , একপ্রকারের দুর্লভ বাদুড় – ফ্লাইং ফক্স — চাইলে এখানে কি না মেলে! শহরের রাস্তাঘাটে এছাড়াও বেশ জনপ্রিয় বৃহৎ কালো ঠোঁটওয়ালা আইবিস পাখি যাকে হঠাৎ উড়লে মনে হয় ছোটখাট আর্কিওপটেরিক্স ডানা মেলেছে আদিম সভ্যতার দরজায় একলা কড়া নেড়ে।

৩) এবার আসি সমুদ্রের কথায়। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের চার ধারেই সমুদ্র। সিডনি বা মেলবর্ণ শহরের এইদিকটা পুরোটাই ঘেরা প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে। সূর্যের আলো পড়লে চকচকে নীল স্থির জলরাশি দেখে এমন কোনো পাষাণহৃদয় বোধহয় নেই যার মন শান্ত ধীর হয়ে উঠবেনা। তবে যেহেতু অস্ট্রেলিয়া বলতে গেলে নিজেই এক আশ্চর্য সুবিশাল দ্বীপ, তাই এর মানচিত্রে পাহাড়, বরফও এমন কিছু বেমানান নয়। এমনকি, দেশের মধ্যভাগ জুড়ে অবস্থান করছে এক অতিকায় লালচে শুষ্ক মরুভূমিও যাদের মধ্যে উলুরু অঞ্চলের রূপ সৌন্দর্য সর্বজনবিদিত। মনে আছে, প্রথমবার যখন শহর ছেড়ে হাইওয়ে ধরে বেড়িয়ে পড়েছিলাম বন্ধুবান্ধবেরা মিলে একসাথে, হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠা সবুজ শ্যামল পাহাড়িয়া প্রস্তরের ধার বরাবর কল্লোলিনী সমুদ্রকে এঁকেবেঁকে পথ করে নিতে দেখে মনে হয়েছিল, “পাহাড় ভালোবাসো না সমুদ্র?”— এই প্রশ্নটাই সর্বান্তঃকরণে অবান্তর। প্রকৃতিজ সমাবেশে সবই সুন্দর তার আপন রূপমাধুরীর মহিমায়।

আর বাকি রইল সুন্দরী রমণী? তা এখানে সৌন্দর্যের ব্যাখ্যাটাই কিন্তু অন্যরকম। তুমি যেমনই হও — কালো, মোটা, বেঢপ,বেঁটে, ঢ্যাঙা— সব রূপেই তুমি অনন্যা। তুমি কিভাবে সাজাবে নিজেকে, কোন বেশভূষা মানাবে তোমায়, তার নির্ণায়কও তুমিই। অন্যদের সেই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা থাকেনা। তাই শুধু সৈকতপ্রান্তেই নয়, এখানে ঘরে ঘরে আরাধ্য প্রকৃত সৌন্দর্য রোজকার জীবনতরঙ্গের তাল মিলিয়েই।

৪) ছোটবেলায় বিকেলে বেড়িয়ে পাশের পাড়ায়ও যদি কোনোদিন ঘুরেফিরে দেখেছি, মনে হয়েছে, “ইশ, বড্ড ভালো আছে তো এরা!” এরকমই হয়। কোনো ছোটখাট সফর বা ভ্রমণে সব কিছুই বড় নিখুঁত,সুন্দর মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে যখন কোথাও কয়েক বছরের জন্য ভিটেমাটি ছেড়ে সংসার গাঁথতে হয়, সবকিছুর আর এমন করে তখন এত সহজেই সরলীকরণ হয় না। কলকাতায় কখনও বিশেষ হিসাবনিকাশ করে চলার প্রয়োজন পড়েনি। যখন যেমন দরকার পড়েছে ট্যাক্সি, ওলা, উবের ডেকেছি বা নিজের গাড়ির পিছনের সিটে অফিস ফেরতা আরাম করে ঘুমিয়ে পড়েছি, স্টিয়ারিং থেকেছে ড্রাইভারের হাতে। বাড়িতে ঘড় পরিষ্কার, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, রান্না করার আলাদা আলাদা লোক থেকেছে, যে কোনো দরকারে মিস্ত্রি এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। বিদেশে এই সমস্ত কিছুই কিন্তু নির্মম বিলাসিতা।

জীবনযাপনের একধাক্কায় এত অবনতিও যে সম্ভব, চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা দায়। বাকি যেকোনো প্রথম বিশ্বের দেশেরই একই অবস্থা, তবে তার মধ্যেও সিডনি নিঃসন্দেহে বহুল খরচাসাপেক্ষ। চাইলেও এখানে কোনো পেশাদারের সাহায্য চাওয়া এতটাই ব্যয়সাধ্য, যে বাধ্য হয়েই ঘরের খাটটুকুও পর্যন্ত নিজেদেরকেই অ্যাসেম্বল করতে হয়। তবে এখানে এসেই বলতে গেলে প্রথমবার স্বাবলম্বীও হয়তো হতে পেরেছি। নিজের কাজ নিজে করে নেওয়ায় কেউ ছোটবড় হয়ে যায়না— উপলব্ধি করেছি একথাও।এখানের ছোট ছোট বাচ্চাদেরও যা দায়িত্ববোধ চোখে পড়েছে, তাতে নিজেদেরই বেশ লজ্জায় পরতে হয় মাঝে মাঝে। তবে সপ্তাহব্যাপী কাজকর্মের শেষে শনি-রবি বাঁচার মতো বেঁচে নেওয়ার পাঠও কিন্তু শেখা এখানের আপনপর ভোলা হুজুগে হাসিঠাট্টার মাঝে।

৫) যদি বলি ১৭৭০ সালের ২২শে অগস্ট ইংল্যাণ্ডের দাপুটে ক্যাপটেন, জেমস কুক সিডনির বন্দরে প্রথম পা রাখার প্রায় চল্লিশ হাজারেরও বেশি বছর আগে থেকেই অলিখিতভাবে বইতে শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়ার আজব এক অদ্ভুত লুপ্তপ্রায় ইতিহাস, তবে তা কোনোমতেই বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। হিমযুগের শেষ লগ্নে আফ্রিকাজাত প্রথম হোমো স্যাপিয়ন গোষ্ঠী যখন একে একে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, আনুমানিক সেইসময় থেকেই এদেশেও বাস শুরু আদিম মানুষের। এরপর একসময় হিমযুগ শেষ হল।

লোকচক্ষুর আড়ালে দক্ষিণ গোলার্ধের এক সুদূর প্রান্তে বাঁধা পরে গেল এই বৃহত্তম দ্বীপপুঞ্জ। যে সময় বাকি পৃথিবীর সব দেশ একে অপরের থেকে শিখে সভ্যতার এক একটা ধাপ উত্তরণে ব্যস্ত, নিস্তরঙ্গ নিবিড় এই প্রকৃতির বুকে গড়ে ওঠা আদিবাসী সমাজ তখন একা হাতে সামলে চলেছে মানবজাতির আর এক অজানা কথন। ইংরেজরা এই মহাদেশ দখল করে নেওয়ার পর পুরোনো এই সহজ সরল মানুগুলোকে একরকম প্রায় ভুলে গিয়েই নতুনভাবে রচনা করেছিল বটে এক সাদা চামড়ার গল্প — তবে তাতে সত্যিকারের ইতিহাসের গায়ে কোনো আঁচড় পড়েনা। আর তাই অবশেষে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভুল স্বীকার করে এই আদিম গোষ্ঠীদের আজ অস্ট্রেলিয়া করেছে সমাদৃত।

এছাড়াও পরবর্তী দুশো বছরের ইতিহাসেও বারবার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানান অভিবাসনকারী পাড়ি জমিয়েছে এই উপকূলে। কখনও সোনা খোঁজার চেষ্টায় কখনও স্বচ্ছল ভাবে জীবনধারণ করার একান্ত আবদারে। আর তাই গোড়া সাহেবের সোনালি চুলদাড়িগুলো কিন্তু আজ শহরগুলির বুকে অন্তত ব্যাকসিটেই।

নাঃ, একবছরে যে অস্ট্রেলিয়াকে আমি দেখেছি, তার কাছে এটুকু লেখা যেন অনেকটা নামভূমিকার মতোই। তবুও, ট্যারাব্যাঁকা হলেও অন্ততপক্ষে কিছুটা ধারণা আঁকতে পারলাম বলেই থাকলাম বিশ্বাসী। সময়সুযোগ করে ভবিষ্যতে নাহয় আবার আনব দ্বীপ বরাবর এই মহাদেশের গল্প— আজ কেবল বেঁচে থাকি নির্নিমেষ প্রবাসের এই ভিন্ন সাবলীল চেতনায়।